

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ায় তাৎক্ষণিক স্বস্তি তৈরি হয়েছে বটে, তবে গত ছয় সপ্তাহের সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
বিশ্বনেতাদের আশঙ্কা, এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও যুদ্ধের ফলে তৈরি হওয়া ফাটল সহজে মেরামত হবে না। ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফিরে যে অনিশ্চয়তাপূর্ণ বৈশ্বিক পরিবেশ তৈরি করেছেন, তাতে মিত্র ও প্রতিপক্ষ—উভয় পক্ষই দোটানায় পড়েছে। তাঁর আকস্মিক সিদ্ধান্ত, হুমকি ও অবস্থান বদলের কারণে বহু দেশ নিজেদের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর পথ খুঁজে পায়নি।
ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোকে রাসমুসেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, “আজকের পৃথিবী নিঃসন্দেহে গতকালের চেয়ে ভালো। কিন্তু ৪০ দিন আগের চেয়ে ভালো কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।” তাঁর এই মন্তব্য বিশ্বনেতাদের সামগ্রিক উদ্বেগই তুলে ধরে।
ইরান যুদ্ধের কড়া সমালোচক স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “যুদ্ধবিরতি অবশ্যই ভালো খবর, বিশেষ করে যদি তা ন্যায়সংগত ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ তৈরি করে।” তবে তিনি ট্রাম্পের সামরিক নীতির কঠোর সমালোচনা করে বলেন, “পৃথিবীতে আগুন লাগিয়ে পরে এক বালতি পানি নিয়ে হাজির হলে তাকে সাধুবাদ দেওয়া যায় না। এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন কূটনীতি, আন্তর্জাতিক আইন ও শান্তি।”
ইউরোপের বাইরেও ওমান, জাপান, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়াসহ বহু দেশ যুদ্ধবিরতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ বলেন, “এই যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, অস্ট্রেলিয়া ও আমাদের পুরো অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবনেও বড় প্রভাব ফেলছে।” তিনি ট্রাম্পের আগের হুমকিমূলক বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, এমন ভাষা কোনো দায়িত্বশীল নেতার জন্য শোভন নয়।
যুদ্ধের বড় প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত সীমিত করে দেয়, যা বিশ্ব তেল ও গ্যাস সরবরাহে বড় ধাক্কা আনে। এর ফলে জ্বালানির দাম বেড়ে যায়, সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়, এবং বহু সরকারকে জনগণের চাপ কমাতে জরুরি ভর্তুকি ও কর ছাড় দিতে হয়।
জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস বলেন, “এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের স্থায়ী অবসান নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে ভয়াবহ বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটও ঠেকাতে হবে।” ইউরোপীয় দেশগুলো গত এক মাস ধরে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অভিঘাত সামাল দিতে ব্যস্ত।
ইতালিতে জ্বালানি সংকট রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়েছে। ইতালির শিক্ষকদের একটি সংগঠন সতর্ক করেছে, সংকট দীর্ঘ হলে স্কুল খোলা রাখাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি জনগণকে কিছুটা স্বস্তি দিতে জ্বালানির ওপর কর কমিয়েছেন। একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে স্পেনও। জার্মানিতে গ্যাস স্টেশনগুলোকে দিনে মাত্র একবার দাম বাড়ানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
ইউরোপীয় ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশনের হিসাব অনুযায়ী, সংকট দীর্ঘ হলে চলতি বছরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি সাধারণ পরিবারের জ্বালানি ব্যয় প্রায় ২ হাজার ইউরো পর্যন্ত বাড়তে পারে।
বিশ্বনেতাদের সবচেয়ে বড় হতাশা হলো, ট্রাম্পকে প্রভাবিত করার মতো কার্যকর কূটনৈতিক শক্তি তাদের হাতে নেই। তাঁর অনির্দেশ্য অবস্থান ও আক্রমণাত্মক বক্তব্যের কারণে বিশ্বনেতাদের অনেকেই কখন সমর্থন, কখন নীরবতা, আর কখন মৃদু সমালোচনার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প ইরানকে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, চুক্তি না হলে “সভ্যতার মৃত্যু” ঘটবে। কিন্তু জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের শীর্ষ নেতারা তখন প্রকাশ্যে তার সমালোচনা করেননি। বিশ্লেষকদের মতে, তাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবে নীরব থেকেছেন, যাতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত না হয়।
এদিকে, যুদ্ধবিরতির আগে থেকেই যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সফরের পরিকল্পনা করেছিলেন। এই সফরে তিনি মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে হরমুজ প্রণালি স্থায়ীভাবে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখার বিষয়ে আলোচনা করবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধবিরতি সাময়িক স্বস্তি দিলেও ক্ষতিগ্রস্ত জ্বালানি অবকাঠামো ও ভেঙে পড়া আস্থার সংকট কাটাতে সময় লাগবে। ইতালির বক্কোনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক টিটো বোয়েরি বলেন, “হরমুজ প্রণালি খুলে গেলেও আগের সক্ষমতায় ফিরতে অনেক সময় লাগবে।”
অর্থাৎ, যুদ্ধবিরতি তাৎক্ষণিক স্বস্তি আনলেও, বিশ্ব এখনো ট্রাম্পের অনিশ্চিত নীতি এবং যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগে আছে।






















