

লেখক: মাহিদ হায়দার চৌধুরী
কানাডায় রমজান কেবল সূর্যাস্ত পর্যন্ত উপবাসের নাম নয়; এটি এক বহুসাংস্কৃতিক সহাবস্থানের জীবন্ত উদাহরণ। বরফঢাকা এই দেশে রমজান এলে মসজিদগুলো শুধু ইবাদতের স্থান থাকে না, হয়ে ওঠে সামাজিক সংহতির কেন্দ্র। আশ্চর্যের বিষয় হলো, অমুসলিম প্রতিবেশী, চার্চভিত্তিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী দল এবং স্থানীয় কমিউনিটি সেন্টারগুলোও ইফতার আয়োজন বা খাদ্য সহায়তায় এগিয়ে আসে। অনেক গ্রোসারি স্টোর খেজুর, চাল, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে বিশেষ ছাড় দেয়। ফুড ব্যাংক, কমিউনিটি গ্র্যান্ট ও বিভিন্ন সামাজিক সেবা তহবিল রমজান মাসে সহায়তা কার্যক্রম জোরদার করে। এখানে ধর্মের সীমানা মুছে গিয়ে মানবিকতাই বড় পরিচয়ে পরিণত হয়—একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পবিত্র মাস হয়ে ওঠে সবার অংশগ্রহণের উপলক্ষ।
কিন্তু এই চিত্র যখন দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়, তখন এক ধরনের দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা ভারতের অনেক বাজারে রমজান এলেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। চাহিদাকে পুঁজি করে মুনাফা বাড়ানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়, তৈরি হয় কৃত্রিম সংকট। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে রমজান হয়ে ওঠে বাড়তি ব্যয়ের দুশ্চিন্তার মাস। যে সময়টি সংযম, ত্যাগ ও সহমর্মিতার হওয়ার কথা, সেটিই অনেক ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক সুযোগে রূপ নেয়। তখন প্রশ্ন জাগে—পবিত্র মাস কি কেবল আধ্যাত্মিকতার, নাকি বাজার অর্থনীতিরও মৌসুমি ক্ষেত্র? কানাডার উদারতা আর দক্ষিণ এশিয়ার বাজারের এই বৈপরীত্য আমাদের ভাবতে বাধ্য করে।
অবশ্য কানাডাও সম্পূর্ণ নিখুঁত নয়। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব এখানেও রয়েছে, এবং সব ব্যবসায়ী যে সমানভাবে সহমর্মী, তা বলা যাবে না। তবে সামগ্রিকভাবে এখানে রমজান একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক মুহূর্তে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ একসঙ্গে ইফতার টেবিলে বসে, স্বেচ্ছাসেবীরা ফুড ব্যাংকে খাবার বিতরণ করে, আর প্রতিবেশীরা দানের মাধ্যমে পাশে দাঁড়ায়। এই বাস্তবতা দেখায়, রমজানের আসল শিক্ষা কেবল ইবাদতে সীমাবদ্ধ নয়; তা প্রকাশ পায় আচরণে, ন্যায়বোধে ও সামাজিক দায়বদ্ধতায়। সহমর্মিতা যদি প্রার্থনার অংশ হয়, তবে সেই প্রার্থনাই সমাজকে আলোকিত করে—দেশের সীমানা পেরিয়ে, মানুষের হৃদয়ে।






















